প্রাইভেট স্কুলে পুনঃভর্তি বা সেশন ফি কি অনিয়ম, নাকি টিকে থাকার বাস্তব প্রয়োজন? সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষার ব্যয় কাঠামো, ভর্তুকি ও দায়বদ্ধতার বাস্তব বিশ্লেষণ।
প্রাইভেট স্কুলে সেশন ফি বিতর্ক- একপাক্ষিক আলোচনা কতটা যৌক্তিক:
বাংলাদেশে প্রতি শিক্ষাবর্ষের শুরুতে প্রাইভেট স্কুলের সেশন ফি বা পুনঃভর্তি ফি নিয়ে আলোচনা হয়। অনেকেই এটিকে অনিয়ম বা অপ্রয়োজনীয় বোঝা হিসেবে দেখেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো-এই আলোচনা কি বাস্তবতার সব দিক বিবেচনায় নিয়ে হয়?
প্রাইভেট শিক্ষা ব্যবস্থা কোনো দান বা সরকারি অনুদানের উপর দাঁড়িয়ে নেই। এটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা কাঠামো, যেখানে প্রতিটি ব্যয়ের উৎস নির্ধারিত হয় শিক্ষার্থীদের ফি থেকেই।
সরকারি ও প্রাইভেট স্কুলের অর্থনৈতিক পার্থক্য:
সরকারি স্কুলে পড়াশোনার ক্ষেত্রে-
a. শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন সরকার দেয়
b. ভবন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ রাষ্ট্র বহন করে
c. পাঠ্যবই সরকার সরবরাহ করে
d. প্রশিক্ষণ, কারিকুলাম, পরিদর্শন রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে হয়
অন্যদিকে প্রাইভেট স্কুলে-
a. শিক্ষক বেতন সম্পূর্ণভাবে টিউশন ও সেশন ফি থেকে আসে
b. ভাড়া, বিদ্যুৎ, পানি, নিরাপত্তা, আইটি সিস্টেম নিজস্ব অর্থায়নে চলে
c. ডিজিটাল ক্লাস, ল্যাব, কো-কারিকুলার কার্যক্রম আলাদা খরচের বিষয়
এই দুই ব্যবস্থাকে একই মানদণ্ডে বিচার করলে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
সেশন ফি আসলে কীসের জন্য নেওয়া হয়:
সেশন ফি মানেই নতুন করে ভর্তি-এই ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। এটি মূলত একটি Academic Session Preparation Fee।
এই ফি সাধারণত ব্যবহৃত হয়-
a. নতুন শিক্ষাবর্ষের ক্লাস সেটআপ ও সেকশন পুনর্বিন্যাস
b. শিক্ষক নিয়োগ ও ট্রেনিং
c. পরীক্ষার সিস্টেম, প্রশ্নপত্র ও মূল্যায়ন কাঠামো আপডেট
d. সফটওয়্যার, রেজিস্ট্রেশন ও ডাটাবেস রক্ষণাবেক্ষণ
e. কো-কারিকুলার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রস্তুতি
এই ব্যয়গুলো বছরের শুরুতেই একসাথে আসে, যা শুধু মাসিক টিউশন ফি দিয়ে বহন করা প্রায় অসম্ভব।
আন্তর্জাতিক তুলনা কেন সবসময় প্রযোজ্য নয়:
ইউরোপ, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার প্রাইভেট স্কুলে অনেক ক্ষেত্রে আলাদা সেশন ফি নেই-কিন্তু সেখানে বার্ষিক টিউশন ফি বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি।
বাংলাদেশে তুলনামূলক কম টিউশন রেখে এককালীন সেশন ফি নেওয়া হয় যেন-
a. মাসিক খরচ অভিভাবকদের জন্য সহনীয় থাকে
b. স্কুল বছরের শুরুতেই অপারেশনাল খরচ মেটাতে পারে
এটি কাঠামোগত পদ্ধতির পার্থক্য, অনিয়ম নয়।
তাহলে সরকারি স্কুলে ভর্তি না হয়ে প্রাইভেট কেন?
এই প্রশ্নটাই আসলে মূল।
অভিভাবকরা প্রাইভেট স্কুল বেছে নেন কারণ-
a. ক্লাসে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম
b. শিক্ষক-শিক্ষার্থী ইন্টার্যাকশন বেশি
c. ইংরেজি মাধ্যম বা আধুনিক কারিকুলাম
d. সহশিক্ষা কার্যক্রম ও অতিরিক্ত যত্ন
এই সুবিধাগুলো বজায় রাখতে বাড়তি অর্থায়ন প্রয়োজন-যার একটি অংশ আসে সেশন ফি থেকে।
স্বচ্ছতা প্রয়োজন, তবে ধারণাটিকে বাতিল করা নয়:
এটা সত্য, সব স্কুল সবসময় স্বচ্ছ নয়। এখানেই নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা জরুরি।
কিন্তু সমাধান হওয়া উচিত-
a. ফি কাঠামো স্পষ্টভাবে প্রকাশ
b. কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে তা জানানো
c. অভিভাবক-স্কুল কমিউনিকেশন শক্তিশালী করা
সম্পূর্ণভাবে সেশন ফি ধারণাটিকে “দুর্নীতি” বলা বাস্তবতা অস্বীকার করার শামিল।
উপসংহার:
শিক্ষা একটি সামাজিক দায়িত্ব, তবে প্রাইভেট শিক্ষা একইসাথে একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতা। যেখানে রাষ্ট্র সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করে না, সেখানে কিছু কাঠামোগত ফি থাকা অস্বাভাবিক নয়।
প্রশ্ন হওয়া উচিত-
ফি আছে কি না নয়, বরং ফি কতটা যৌক্তিক, কতটা স্বচ্ছ এবং শিক্ষার মানে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে।
সচেতন প্রশ্ন পরিবর্তনের পথ খুলে দেয়, কিন্তু বাস্তবতা অস্বীকার করলে সমাধান আসে না।
FAQ:
১. প্রশ্ন: পুনঃভর্তি ফি কি আইনসিদ্ধ?
উত্তর: নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ও নীতিমালা অনুযায়ী হলে এটি বেআইনি নয়।
২. প্রশ্ন: সব স্কুল কি একই অঙ্ক নিতে পারে?
উত্তর: না, স্কুলের মান, অবকাঠামো ও সুবিধা অনুযায়ী পার্থক্য হয়।
৩. প্রশ্ন: সেশন ফি না নিলে কী হবে?
উত্তর: অনেক স্কুল মাসিক টিউশন বাড়াতে বাধ্য হবে।
৪. প্রশ্ন: অভিভাবক কীভাবে যাচাই করবেন?
উত্তর: স্কুলের ফি ব্রেকডাউন ও বার্ষিক পরিকল্পনা জানতে চাইতে পারেন।
পোস্ট ট্যাগ:
session fee, re admission fee, private school education, bangladesh education system, school fees explanation, private vs government school, education cost, school management, academic session fee, education economics
